ভ্রমন বৃত্তান্ত

তিস্তা ব্যারেজে ভ্রমণ

ফের দেখিলাম ভাটির দেশ


অসাধারণ এক জাদুকরী জায়গা তিস্তা! আড়ালে আবডালে কিংবা স্বশরীরে স্বমহিমায় সগর্বে আপনাকে ডাকবেই।


Traveler ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬, ১৫:০০


“টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া”  সংগঠনটির সদস্যদের কাছে লালমনিরহাট বলতেই ভাললাগার এক বিশাল মরুদ্যান হয়ে ছিল ।লালমনিরহাট মানেই প্রচন্ড শীতে ঠক ঠক করে কাঁপা ভোরে গাঁয়ের কাঁচা রাস্তায় হেঁটে যাবার পুরনো খায়েশ। এই ভাললাগাই পুষে রেখেছি কয়েকবছর ধরে। আমাদের ট্যূর ম্যাপটাই সাজানো লালমনিরহাট আর কুড়িগ্রামকে ঘিরে। আর ঘিরে রাখা এই ভালবাসাই এবার আমাদের সুযোগ করে দেয় আমাদের গন্তব্যে!

হাঁক ছেড়ে গান ধরেছে কেউ!কেউ বা কৃষি কাজে ধুম ব্যস্ত। সন্ধ্যা হলেই সেই চিরচেনা ছবি আঁকা এখনো এই গাঁ গুলোতে।সত্যি কি অসাধারণ।দখিনা বাতাসের মাতাল সুর, মন নিয়ে যায় অচিনপুর। এপার আমার ওপাড় আমার মাঝখানে সেই শুকনো নদী!নদী নাকি মরা খাল? আমার ভালোবাসার বীজ বুনেছিলাম যে ঘাটে সে ঘাটে নোঙ্গর হবে না আমার তরী? সেই সুদুরের সুচেনা সুর, বাহের দেশে সুমধুর। মন প্রাণ সব ছিনিয়ে নিয়ে গেল সবুজ ডালপালার সবুজ বনানী।ঘুমের দেশে কি এমন হয়! নাকি মাতাল রাজ্যে এমন হয়। ভাটির দেশে এমন হয়।

সারি সারি গরুর গাড়ি এখন আর তেমন চোখে পড়ে না আজ আর ভাটির দেশে।চোখে পড়ে না লাল টুকটুকে বউটির মাথায় কাপড় দিয়ে গরুর গাড়িতে চড়ে বাপের বাড়ি যাওয়া কিংবা শ্বশুর বাড়ি যাওয়া।বারবার তার ডাগর চোখ জোড়া দিয়ে পিছন পানে চেয়ে থাকা। যান্ত্রিক সভ্যতা আদিমতাকে বিদায় করে নতুনত্ব দিয়েছে, কিন্তু প্রান কেড়ে নিয়েছে।এ প্রাণ ম্রিয় হয়ে গেছে অনেক আগে। কফিনে শেষ পেরেক হয়ত বাকি!

বন্ধু তুষার এখন পুরোদস্তর ব্যবসায়ী। ওর হাতে সময় খুব বেশী নেই। ইয়াসিনের ব্যস্ততাও কম নয়। তবুও এই ব্যস্ত সময় থেকেই সময় বের করে সবাই যাত্রা করলাম উত্তরবঙ্গে।সায়েদাবাদ থেকে রাতে যাত্রা করে খুব ভোরে ভোরে পৌছে যাই লালমনিরহাট সদরে।

 

আজ ৩১ জানুয়ারী, ২০১৫........বছরের শেষ দিন

সারারাতের ধকল কাটাতে এসেই বিশ্রাম নিতে গিয়েই গা টা কিছুটা এলিয়ে দিলাম নরম বিছানায়। ঘুম যেন পেয়ে বসতে লাগল আমাদের। তবে সেই সুযোগটা দিলাম না কেউই। মোটামুটির ২-৩ ঘন্টার এক বিশ্রাম শেষে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম গরম গরম মিষ্টির স্বাদে। এরপরই আমরা যাত্রা শুরু করলাম তিস্তা ব্যারেজের দিকে।ভ্রমণটা একটু আনন্দদায়ক করতেই বাস ছেড়ে উঠে পড়লাম স্থলবন্দর বুড়িমারীগামী ট্রাকে।সিগন্যাল দিতেই থেমে গেল ট্রাক আর আমরাও উঠে পড়লাম হাতীবান্ধার উদ্দেশ্যে।ট্রাকটি ঢাকা থেকেই এসেছে। ড্রাইভার যখনই শুনলেন আমরাও ঢাকা থেকে ভ্রমণের উদ্দেশ্যেই গিয়েছি তখন তো তিনি রীতিমত খাতির শুরু করে দিলেন। ঢুলুঢুলু ভাঙা-চোরা রাস্তা দিয়ে দেড় ঘন্টারও বেশী সময় পর আমরা বড়হাতা গিয়ে নামি। এই জায়গাটা হাতীবান্ধা থেকে আরো বেশ কিছু পথ।নামার সময় ড্রাইভার হেল্পার কেউেই ভাড়া নেবেনা!! এত সাধলাম নেবেনা তো নেবেই না। অবশেষে বহুকষ্টে দুইজনকে নাস্তার জন্য কিছু টাকা নেওয়াতে সক্ষম হলাম।

নাহ! কোন শীতই নেই। তাই শীতের কাপড় এক দোকানে রেখেই আমরা তিস্তায়। হ্যা এইতো ব্যারেজ! কতদিন দেখব বলে স্বপ্ন দেখেছি। কতদিন স্বপ্নে ভ্রমণ করেছি। আজ এই সেই তিস্তার সামনেই দাঁড়িয়ে! ব্যারেজের দৈর্ঘ্য ৬১৫ মিটার, গেট ৪৪ টি। ক্যানেল হেড রেগুলেটর ১১০ মিটার দীর্ঘ, গেট  ৮ টি। পুরো ব্যারেজ জুড়ে রয়েছে ৫২ টি গেট। শীতের এই তিস্তা দেখে ভিতরটা সত্যিই খা খা করে উঠল আমাদের! নেই কোথাও নেই পানির তেমন স্রোত। তবে এদিকটা সত্যিই চমৎকার একটি জায়গা। এখান থেকেই শরৎ-হেমন্তে বরফাচ্ছন্ন কাঞ্চনজংঘার  পর্বত শৃঙ্গ দৃশ্যমান হয়। তবে আমাদের কপাল মন্দ সেই ভাগ্য আর হলোনা।

কিভাবে যাবেন : তিস্তা ব্যারেজ যাবার জন্য ঢাকার গাবতলী, মহাখালী থেকে হাতীবান্ধার সরাসরি বাস পাওয়া যাবে। বাস পাবেন সায়েদাবাদ থেকেও তবে তা লোকাল। হাতীবান্ধায় থাকার খুব ভালমানের হোটেল না থাকায় লালমনিরহাট সদরেই থাকতে পারেন। সদর থেকে বড়হাতা গামী বাসে উঠতে পারেন। ভাড়া ৯০ টাকা যা একটু বেশীই। সেখান থেকে অটোতে যেতে পারেন তিস্তা ব্যারেজে ভাড়া ১০ টাকা। ট্রেনে গেলে লালমনি এক্সপ্রেস রয়েছে যা ঢাকা থেকে ১০:১০ ছেড়ে যায়।

 

লেখা ছবি : নাসির আহমেদ

ফেসবুক পেজ : টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া

https://www.facebook.com/Teknaf-Theke-Tetulia-468904906483345/?fref=ts




এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।