খবরাখবর

মনুষ্যত্ব এবং আমরা

মনুষ্যত্ব কেন জ্বলছে এখন তাকিয়ে দেখা আগুনে?


তিনি বলেন, “বলছি আমি মহিলা একটা চাদর দেন। কেউ দেয়না। বিল্ডিং এর মহিলারা কেউ দেয়না... আল্লাহ মাফ করুক সবাইকে”।


student of Computer Science and Engineering(CSE) ০৩ মার্চ ২০১৬, ২১:৪৫


আপনার প্রিয় মানুষটা কে? বাবা, মা বা অন্য কেউ? আচ্ছা, কল্পনা করুন আপনার প্রিয় মানুষটার গায়ে আগুন লেগেছে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। পুড়ে যাচ্ছে তার পুরোটা শরীর। আর আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছেন।

কি কষ্ট হচ্ছে এমন কিছু কল্পনা করতে? অথচ আমাদের মনুষ্যত্ব এখন এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এই কাল্পনিক ভয়াবহ দৃশ্যই বাস্তব হচ্ছে।

গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তরার একটি বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনায় আগুনে পুড়ে ইতোমধ্যেই মারা গেছেন সুমাইয়া আক্তার নামক একজন নারীর স্বামী মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা শাহীন শাহনেওয়াজ এবং তাদের দু সন্তান পনের বছরের শার্লিন আর ১৬ মাস বয়সী জায়ান।

সুমাইয়া তার ভাইয়ের সাথে আগুন লাগার ঘটনা নিয়ে কথা বলেন। সে কথাগুলো রেকর্ড করেন তিনি এবং পরবর্তীতে ফেসবুকে পোষ্ট করেন।

স্বজনদের সঙ্গে আলাপকালে সুমাইয়া আক্তার বলেন, চিৎকার দিয়ে নামতেছি- আগুন লাগছে সাহায্য করেন। বাঁচান বাঁচান। গায়ে তো আগুন। তিন আর চার নম্বর ফ্লোর থেকে দরজা খুলছে। আমাদের দেখে দরজা বন্ধ করে দিছে। স্পষ্ট মনে আছে। সাত তলা থেকে নামছি। তিন তলার লোকেরা একটা তোষক দিয়ে যদি জড়ায়া ধরতো। একটা তোষক না হয় পুড়তো। আমার বাচ্চাগুলো তো বাঁচতো।

উপরের লেখাটা পড়ে কি আপনার চোখে জল আসছে না? ভাবতে পারেন একটা মানুষ গায়ে আগুন নিয়ে দৌড়াচ্ছে আর আপনি দরজা বন্ধ করে দিচ্ছেন। তার জায়গায় একবার আপনার কাছের কোন মানুষকে কল্পনা করবেন দয়া করে?

ফেসবুকে পাওয়া অডিওতে সুমাইয়া বলেন বাসার চুলায় গ্যাসের পাওয়ার কম ছিল। বাসায় ওঠলাম সিলিন্ডার গ্যাস ছিলোনা। তিনদিন কিনে খেয়েছি খাবার। তারপর মিস্ত্রি এসে রাইজার বাড়িয়ে পাওয়ার ঠিক করে দিচ্ছে। তারপরও গ্যাস লিক করতো। গ্যাসের গন্ধ পাইছি। জানালা খোলা রাখতাম। 

তিনি বলেন গ্যাসের গন্ধ পেয়ে রাতেও তার স্বামী মোমবাতি জ্বালিয়ে চেক করেছেন। পরে বললো মনে হয় ওপরে ছাদ থেকে আসতেছে। চুলা অল্প জ্বালিয়ে চায়ের পানি দিছি। ওর আব্বু বললো ঘরে গ্যাসের গন্ধ আসছে, ফ্যানটা ছেড়ে দেই। ফ্যান ছেড়ে জানালা খুলে দেয়ার জন্যে। জায়ান ওর বাবার কোলে। যেই ফ্যানটা ছেড়ে দেবার পরে দাউ দাউ করে আগুন। সেকেন্ডের মধ্যে এতো আগুন। “আসলে ডাইনিং রুমটাই গ্যাস ভরা ছিলো। শার্লিনের রুম ছিল রান্না ঘরের পাশেই। একটা জানালা সম্ভবত বন্ধ ছিল।

কি হৃদয় বিদারক ঘটনা ভাবতে পারছেন? আর এরপরের কথাগুলো তিনি কি বলেছেন জানেন?

তিনি বলেন পরে নীচে নেমে কাপড় তো পুড়ে গেলো। নীচে ছিলো ছালার চট। টাইনা গায়ে দিছি। কত মানুষ, সবাই তাকায়া আছে, কেউ আগায়না। বলছি আমি মহিলা একটা চাদর দেন। কেউ দেয়না। বিল্ডিং এর মহিলারা কেউ দেয়না... আল্লাহ মাফ করুক সবাইকে। পরে নীচে নেমে চিৎকার দিয়ে দারোয়ানকে বললাম আমার দু ছেলে ওপরে আটকা পড়ছে, আপনারা তাড়াতাড়ি যান। তারা যেতে যেতে শালীন পুড়ে গেছে।

তিনি আরোও বলেন, শার্লিন পুড়েছে বেশি। গায়ে পা থকথক হয়ে গেছে। শার্লিন বলে আমি তো বাঁচবোনা আমাকে মাফ করে দিয়ো আম্মু। আমি বলি বাবা তুই বাঁচিস। আমি মইরা যাই। মানুষ এরকম হয়। কেউ কাউরে একটু সাহায্য করেনা। এটা কি কথা?

একজন মায়ের জীবনে এর চেয়ে কষ্টের মুহূর্ত আর কি হতে পারে বলবেন কি? শার্লিন মারা গেছে। জায়ানও মারা গেছে। আর সাথে মরে গেছে আমাদের মনুষ্যত্ব। একজন আগুনে পোড়া শিশুকে বাঁচানোর ইচ্ছা আমাদের মস্তিষ্কে আসেনি। একজন নারীর গায়ে চাদর দেয়ার মত চিন্তা আমাদের মস্তিকে আসেনি। পচন ধরেছে আমাদের মানসিকতায়, আমাদের মনুষ্যত্বে।

তথ্যসুত্রঃ বিবিসি


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।